মহাসড়ক বন্ধক রেখে ১৫ কোটি টাকা ঋণ, দুদককে অনুসন্ধানের নির্দেশ !

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরার আজমপুর অংশের সরকারি জমি বন্ধক রেখে একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ১৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার ঘটনা অনুসন্ধান করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে আগামী ২৬ জুনের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ওইদিন পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট।

সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক আদেশের বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন।

এ সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানি নিয়ে সোমবার (২৫ এপ্রিল) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

আদালতে আজ রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অনীক আর হক ও মো.তামজীদ হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক।

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘মহাসড়ক বন্ধক দেখিয়ে লুটপাট ১৫ কোটি টাকা’ শিরোনোমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আইনজীবী ওবায়েদ আহমেদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. তামজীদ হাসান এ রিট করেন।

রিটে দুদক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।

রিট বিষয়ে আইনজীবী তামজীদ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, মহাসড়কের জায়গা বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার ঘটনা একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদনে প্রচারিত হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সম্প্রতি গোলাম ফারুক একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার হন। কিন্তু মহসড়কের জমি বন্ধকের ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ওই ঘটনার তদন্ত চেয়ে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এছাড়া দুর্নীতির ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, এ মর্মে রুল জারির আর্জিও জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাসড়কের সরকারি জমি বন্ধক রেখেই একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন মো. গোলাম ফারুক নামের এক ভয়ঙ্কর প্রতারক। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তিনি বাগিয়ে নেন মোটা অঙ্কের এ ঋণ। তবে সেটি ধরা পড়ার পর আবার সংশোধন করেন দলিল। এবার আগের বন্ধককৃত জমির দাগ নম্বর পরিবর্তন করে ব্যাংকে জমা দেন।

সংশোধিত দলিলের জমিতে বন্ধকি সম্পত্তির সাইনবোর্ড স্থাপনের চেষ্টা করলে ব্যাংক জানতে পারে সেটিও ভুয়া। সংশোধিত দলিলের জমির আসল মালিক জামির আলী। ২৭ শতাংশের ওই জমি দখলে নিতে একাধিকবার তার ওপর হামলা ও হত্যাচেষ্টা চলে। অবশেষে গত ১৪ এপ্রিল দিনগত রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে ফারুকসহ তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফিরোজ আল মামুন ওরফে ফিরোজকে গ্রেফতার করে র্যাব।

পরদিন ১৫ এপ্রিল দুপুরে কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বাড্ডা থানাধীন মেরুল বাড্ডা এলাকায় জাল দলিল সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটে। যেখানে ভিকটিমকে নিজ জমি থেকে জোরপূর্বক উৎখাত করার উদ্দেশ্যে প্রতারক গোলাম ফারুক ও তার প্রধান সহযোগী ফিরোজ আল মামুনসহ অন্যরা গত ২৬ মার্চ ও ৬ এপ্রিল হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে। ওই ঘটনায় ভিকটিম আদালতে একটি নালিশি দরখাস্ত করে। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে রাজধানীর বাড্ডা থানাকে এফআইআর হিসেবে এটিকে গণ্য করার আদেশ দেয়। এ বিষয়ে বাড্ডা থানায় একটি মামলা হয়।

র্যাব ওই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই গ্রেফতাররা বাড্ডায় হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য দেয়। মহাসড়কের জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্যও দিয়েছে তারা।

মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী জামির আলী বলেন, আমার উত্তরার ২৭ শতাংশ জমি গ্রেফতার ফারুক দখল করার চেষ্টা করছিলেন। তাদের কাছে ওই জমির কোনো দাগ খতিয়ান নেই। এছাড়াও ওই জায়গা বন্ধক দিয়ে একটি ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ১৫ কোটি টাকা লোন নেন। যা আমার অনুপস্থিতিতে আমার ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে অভিযোগ করলে তারা ব্যবস্থা নেননি।

জানা গেছে, ২০২১ সালের এপ্রিলে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মহাসড়কের জমি ব্যক্তি নামে নিবন্ধন, বিক্রয়, ব্যাংকে বন্ধক ও ব্যাংক কর্তৃক নিলামে বিক্রি চেষ্টার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। ওই ঘটনায় ভূমি মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে একটি প্রতারকচক্র মহাসড়ক শ্রেণিভুক্ত সরকারি জমি কয়েকটি সরকারি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি ভূমি ব্যক্তি মালিকানায় নিবন্ধন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নেয়। যদিও এসব জমি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধিগ্রহণ করা।

১৯৪৮ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরার আজমপুর অংশের অধিগ্রহণ হওয়ার পূর্বের জমির মালিকের ছেলেকে খুঁজে বের করেন। জালিয়াতির সাহায্যে তিনি ২০০৬ সালে মিথ্যা তথ্য দিয়ে একটি ভুয়া দলিল তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে ওই দলিলমূলে তৎকালীন মালিকের ছেলের কাছ থেকে ফারুক তার স্ত্রীর নামে ২০১০ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ক্রয় করে আরেকটি দলিল তৈরি করেন। একই বছরে তার স্ত্রীর কাছ থেকে ওই জমি নিজের নামে দলিল করে নেন।

মহাসড়কের জমিকে নিজের বলে দেখিয়ে বেসরকারি ব্যাংকে বন্ধক দেখান। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে নিয়ে নেন ১৫ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় ২০১৩ সালে ব্যাংক অর্থ আদায়ের উদ্দেশে বন্ধকি জমি নিলামে বিক্রি করার নোটিশ জারি করলে ব্যাংক সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায়, জমিটি সরকারি সম্পত্তি।

পরবর্তী সময়ে তিনি ভুল সংশোধন দলিল করে পূর্বের বন্ধককৃত জমির দাগ নম্বর পরিবর্তন করে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী জামির আলীর জমির দাগ নম্বর উল্লেখ করেন। তখন ব্যাংক সেই জমিতে বন্ধকি সম্পত্তির সাইনবোর্ড স্থাপন করতে জানতে পারে সেটিও ভুয়া।

Leave a comment

Your email address will not be published.